একটি গঠনমূলক নির্মাণ

April 24th, 2008

একটি গঠনমূলক নির্মাণ
[২০০৮]

২৭শে জুলাই ২০০৭: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমি, পোড়ো ও প্রস্তর, সেদিক পানে চাইলে বিকালে ও সকাল-সন্ধ্যায় খুব কলরব হয়। কাহাদের অটোকথায় দেখা যায় চামড়া ও রেক্সিনের তেলমোটা রঙ আর নারিকেলবীথি মাঝে লাল-কালো সুর্যাস্তের ক্যালানে ক্যালেন্ডার; কখনোবা হাতেআঁকা নায়িকার বিহ্বল বুকপাছার আশ্চর্য অনুপাত; কারো কারো প্রিয় ডাকনামগুলি; টা টা ওকে হর্ণ প্লিজ; দৈবাৎ বুরি নজরবালা কালা মুখের সচিত্র বিবরণ ও গ্রামীন ব্যাংকের অসীম বদান্যতার কথা। অবশ্য অন্য সময়, যেমন ভো্রে কিংবা শিশুরাতে, সেখানে বাসা বাঁধে কতগুলি পলিথিনজল পরিবার, তাদের অ্যাসবেসটস গেরস্থালীর ঘরোয়া রোয়াব আর স্খলিত ঝামঝগড়ার ঝংকার।

২৭শে মে ২০০৮: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমির উপর নিখুঁতপ্রায় ডাইনোলোহার দাঁত, নবীন ও মুখর, সেদিক পানে চাইলে সকালে ও দুপুরে-বিকেলেও খুব কলরব হয়। ধাতুশব্দে শব্দরূপ শব্দের রূপ পেলে, কাহাদের হাত ও মেশিনবর্তী অঙ্ককাহিনীর জেরক্স জুড়ে দেখা যায় ছোটোবড় কাঠামযাপনের বিজ্ঞপ্তি বিলি হচ্ছে উঠোনে জানালায় আর ইস্পাত সাফল্যে মেদিনীর পুর থেকে তুলে আনা হচ্ছে মাটি ও মদ্যের ঘনঘোলা মিশ্রণ ; তাহাদের ব্যক্তিগত নদীসামগ্রীর ধাতুকলেবর। অথচ অন্য সময়ে, যেমন ভোররাত বা সন্ধ্যার ঝোঁকে, সেখানে সেয়ানা কংক্রীট কাঠের দোহাই দিয়ে নৈঃশব্দ শুয়ে থাকে গোটানো ঘামের ঘ্রাণনির্মাণ আর হলদে বাল্বে ঢাকা ফাঁকা প্রতিধ্বনিমৃদু এক চল্লিশোয়াট সাইক্লপ।

২৭শে মার্চ ২০০৯: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমি থেকে উঠে যায় ধাপসিঁড়ির পোষা সাপ, কালো ও শীতল, সেদিক পানে চাইলে সকাল-বিকাল আর সন্ধ্যেবেলায় খুব কলরব হয়। ফুলটবের বাহারে, ছেঁড়া হাওয়ার টুকরোগুলিকে টাঙিয়ে রাখলে করিডরমহলে দেখা যায় ছোটোবড় সাইকেল জমেছে কাহাদের পাপোষে গণেশে আর ঘরে ঘরে বারান্দাদরোজার পিতলে গাঁথা হয়েছে টিভি বিজ্ঞাপনের বাঁকানো উঠোন ও নাচতে নাজানা রমনীগণের আমরণ অনশন অনিদ্রার কথা। ফলতঃ অন্য সময়ে, যেমন মধ্যরাতে ও চাতালদুপুরে, সেখানে ছোট ছোট বাক্সগুলি থেকে বেরিয়ে আসে ঘুলঘুলিঘষা ভেজা মেঘ আর তাদের ন্যাকাটে আব্দারঘেঁষা ছাঁকনিগুলির ফিস্‌ফিস্‌ শ্বাসধনি; ঘুরন্ত এসিপাখার আবছা ঘুন ঘুন।*

—————————–

* লেখাটি প্রকৃতপক্ষে লেখা হয় এপ্রিল ২০০৮-এ যখন পুরনো ফোল্ডার ঘাঁটতে ঘাঁটতে ২৭শে জুলাই ২০০৭-এর একটি লেখা পাই, যা কিনা, আমার থাকার জায়গার পাশে পড়ে থাকা একটি ফাঁকা জমির দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়ে লেখা, যে জমিটি, সেই সময়ে অর্থাৎ ২০০৮-এর এপ্রিলে, একটি নির্মীয়মান ফ্ল্যাট ইমারতের আদল নিয়েছে। এইসময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমি গদ্যাংশটিকে পুনরায় লেখার চেষ্টা করি, তখন দেখি লক্ষিত বস্তু বদলে যাওয়ায় তার প্রতিচ্ছবিও স্বাভাবিক বদলে যেতে শুরু করেছে। এবিধ আবিষ্কারে আমি পুলকিত হয়ে লেখাটি নতুন করে লিখতে প্রবৃত্ত হই এবং একটি ফাঁকা জমির সামান্য অতীত, দৈনিক বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যত নিয়ে একটি লেখাই তিনবার লিখি তিনটি প্রায়-কাল্পনিক তারিখে, যেগুলির মধ্যে সচেতনভাবে রেখে দিই এক একটি দশ মাসের পোয়াতি ব্যবধান।

বালিকার জন্য চিরকুটগুলি

April 12th, 2008

বালিকার জন্য চিরকুটগুলি
[২০০৮]

চিরকুট ১

এখন সন্ধ্যে নামার আয়োজন অ্যাসফাল্ট শহর জুড়ে এক অটোমোবিল কনসার্ট এখন প্রস্তুতিপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ঢিক্‌ ঢিক্‌ সাউন্ডচেকের তালে তালে হাল্‌কা কোমরদোলানি। ফলতঃ অসংযত সকালের টানা দুপুর পেরিয়ে এ পড়ন্ত বিকেলভূমিতেও যে বালিকাটি লঘুপদে ছোটাছুটি, অহংকারী ভ্রূ-রেখা ও জেদী গ্রীবার বাঁকে এসে সেও একটি হলুদ নাকছাবি ক্রমে অ্যালবামে ও জানালায়।

চিরকুট ২

পাশাপাশি দু’একটি হরফ ছুঁয়ে ফেলতেই শব্দ হারিয়ে যায় ও যা নেমে আসে তা বৃত্তবৎ মুখের হলুদে একটি সার্বজনীন হাসি ও লাল জিভের বাঁকা দাগ। বাকীটুকু বিন্দুবৎ, শুধু কী-বোর্ডের খেলা। এভাবেই আজকাল কথোপকথন হয়, পাঁচ বা সাত খন্ডে।

চিরকুট ৩

কিছু কিছু অস্থিরতা হয় যাদের নাম হয় না ও চেহারাও পরিচয়হীন। সন্ধ্যে সিরিয়ালের ফাঁকা বাতাসে কোনো মুখরা বালিকার ছবি ছেপে এলে শুধু তাদের অবয়ব চোখে পড়ে। আবছা, ফলতঃ অনুসঙ্গহীন।

চিরকুট ৪

তখন ট্রামরাস্তা, দুপুরের ঝিম ফাঁকা বাসের সীটেও পরানো থাকতো জাদুজুতোর হাততালি আর হুশ্‌ বলতেই পৌঁছে যাওয়া যেতো বউবাজার থেকে পার্ক স্ট্রীট; শ্যামবাজার, গোলপার্ক, বরানগর, এন্টালি হয়ে কলেজচত্বরে। পালক ও চামড়ার ডানাগুলি ফুটবোর্ডে, মেট্রোমহলে সারি সারি সাজানো থাকতো যেন কতগুলি জিন্‌সের হাঁটু; এখনি শাট্‌ল ট্যাক্সির পেছনের সীটে বসে গুছিয়ে নেবে নিজেদের প্রাপ্য জায়গা, গুঁতো। এক চরকিবাজির গপ্পো শুনে আজ হঠাৎ এইসব মনে পড়ে।

চিরকুট ৫

অক্ষরগুলি আঙ্গুল ছুঁতেই এক একটি বুদবুদ শান্ত স্ক্রীনজলে কাঁপন তোলে আর এক একটি ‘ডিং’ শব্দে সারাদিন লা লা লা। কথাচ্ছলে এইসব খেলা জমে, অক্ষরে অক্ষরে। (যেন) পরিত্যক্ত রানওয়ে শেষে দেখা যায় একটি সাইকেল, আইসক্রীম বাক্সের গায়ে হাতেআঁকা লালফ্রক, বিনুনির ছবি।

চিরকুট ৬

ধরো একটি ভ্রূ-কুয়াশায় হাত পাততেই চারিদিকে অক্ষরের জাদুঘর। আর চটিচ্ছলে গলিয়ে নিচ্ছো বলে ধরে নাও কোনও অচেনা লাল রোয়াক; অনেকগুলি গাছপাথর পেরিয়ে আসা লেকবিকেলের বাদামকোলাহল; তোমার ও তোমার উৎপলদার ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমাও। আসলে তোমার এখন কোথাও যাওয়ার কথা নেই ;-) । তোমার তালুতে মুঠোতে এখন এক বোতামআঁটা ম্যাজিকবাক্স খোলা।

কিচাইনগাথা

March 16th, 2008

কিচাইনগাথা
[2006]

কিচাইনগাথা: এক

এইভাবে ক্লিক্‌ফাঁদে দীওয়ানা হলে সত্যিই বড় ঝট্‌কা লাগে এসকল নেটযাপন, যেখানে নখাগ্রে ঝিলিক দেয় তামাম দুনিয়া আর মুখ ও মুখের বিকল্পে মুখোশ ও মুখোশেরও বিকল্পে পুনরায় অন্য মুখের ভীড়ে উড়ে যায় আমাদের সামাজিকতার টুপি ও খোলাচুল এই মেঘবন্দরে ছেয়ে যায় চামচা আকাশ। আমরা ভালো থাকি অথবা এভাবেই দাবী করি আমাদের ভালো থাকার সম্ভাবনাসমূহ সুতলিবদ্ধ পুত্তলিকাবৎ হাতে কাপড়ের তলোয়ার আর রাংতার মাথামুকুটে নাচতে থাকে গোপন ইশারার মতো রাষ্ট্রযন্ত্রের অনর্গল তাগিদে। অথচ দ্যাখো, এই প্রাঙ্গনে যেন অন্য কথা ছিলো, কথা ছিলো এবারে আমরা সকলে সিনেমা দেখবো পর্দার উলটো পিঠে আলোকিত থিয়েটারহলে সেইসব চাপা ও কৃষ্ণবর্ণ ছবিগুলি, মানুষের নজর থেকে বেরিয়ে আসা সাদা হলুদ বা কমলা কোনো রোদ না পেয়ে যেগুলি এখন শুকনো ও পাটল। এরকমই যেন কথা ছিলো তবে কার কথা কে ও কবে দিয়েছিলো সে প্রশ্নে এমনকি এ দামড়া আকাশব্যাপী আমাদের নিরন্তর তথ্যযাপনেও কোনো উত্তর থাকে না। ফলে এ চামচক্রান্তে যোগ দেয় প্রযুক্তিস্নেহ, আর মোয়া আসে চমৎকার, জনপ্রতি এক বা দুই, দিগন্ত জুড়ে দেখা যায় আমাদের হাসি হাসি মুখ, যা কিনা ঘন ক্লোজআপে কিছুটা কৃতার্থ করজোর তেলতেলে শব্দেঘেরা সেই হারামী ভাস্কোর জাহাজের পোঁ শোনা থেকে।

কিচাইনগাথা: দুই

জামার হাতা গুটিয়ে কনুইয়ের উপর তুললেই চামড়া কিছুটা সাদাটে ও ফ্যাকাশে যেন রোদ না লাগায় রংগুলি হারিয়ে গ্যাছে ইঁটচাপা ঘাসে। ফলে বারংবার মনে হয় আমরা সকলেই প্রকৃতপ্রস্তাবে ফর্সা ও কর্কটক্রান্তির চড়া রোদে কিছুটা তামাটে মাত্র ভাগ্যদোষে। এবিধ চিন্তা এলেই তৎক্ষণাৎ মেরুদন্ড বেয়ে শির শির ওঠানামা করে চামড়া ও ঘামের রঙসংক্রান্ত এ সুপ্রাচীন ছেনালীগাথা, রূপোর মোড়কে যার চাবুক থেকে সাবানের ফেনা ঘষে উঠে আসে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর প্যাকেট ও তার সাদা আদিখ্যেতার চিট্‌চিটে ঘাম। আমাদের কেল্‌টি চামড়া লোভী অথচ পোষা ফলতঃ লালায়িত কুকুরের মতো বারবারান্দায় বাতিল ডগবিস্কিট খায় গুটোনো লেজ নাড়ে আনুগত্যে ভারী হয়ে ওঠে তার রোঁয়া ও চেনবকলেস আর এ অবশ্যম্ভাবী মেলানিনচক্রের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে যেন কোনো রুগ্ন বেশ্যা সন্ধ্যের ল্যাম্পপোস্টের নিচে সস্তা প্রসাধনের রিবেটে মুছে ফেলে নামধাম, তার বাড়ির ঠিকানা। এ চামচেতনায় বিষাক্ত পাখির ছায়া বাসা বাঁধলে গোপন ছুরির মতো আস্তিন থেকে বেরিয়ে পড়ে বাণিজ্যজাহাজের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে রাখা সাদা স্বভাবগুলির সোনালী হারামিপনা ও পিজারোর নাম লেখা বোতলবন্দী চিঠি ও সনদ, যা দেখে আমাদের চামড়ার বয়স কেঁপে ওঠে মোমবাতির ছিবড়ের মতো পড়ে থাকে শুধু আমাদের লেহনলিপ্সা, আমাদের চামচেতনা, ভয়।

কিচাইনগাথা 1 - 10

ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ ও ঝুপো গোঁপেদের গল্প

March 15th, 2008

ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ ও ঝুপো গোঁপেদের গল্প
[2007]

প্রথম অধ্যায়

সাঁঝের ঝোঁকে ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপের চিল্‌তে বারান্দাবারে ডিগবাজি খায় ঝুপো গোঁপগুলির বাগানো বাগান আর টেবিলের বাদামবিন্যাসে দেখা যায় কুটি কুটি দু’একটি ইংরিজি শব্দ পড়েছে টি-শার্টের কালোতে লেখা হয়েছে মিস্টার লেননের চশমার খোপকাটা গালিচার কথা। এখন ঝুপো গোঁপেদের বাগানো বাগানবারের বারান্দায়, চুপচাপ চাকুর মতো চমৎকার চিন্তা চুষে, আমাগের চেতনার চিতাবাঘ বীয়ার গেলে ইংরিজিতে এবং কথা বলে যেমত অনর্গল তা-ও ইংরিজিতে।

দেখে বোঝাও যায় না ক্যালাকেলি হয়ে গেছে, বহু আগে, গোপনে, কিছুটা বিপ্লবের ঢং-এ।

দ্বিতীয় অধ্যায়

অথচ কি বিকেল কি সন্ধ্যেয়, হাজার গান গাইলেও আজকাল আমাদের ছাদে কেউ বসে বসে কাঁদে না বরং কান্নার কথায় আমাদিগের পেছন ভারী হয় ও খুদে বারবারান্দার টিনসাইনে ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ লেখা হলে সিগারেটের ধোঁয়া পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠার বদলে নীচে নামে। পানশালার সামনে হিসি করলে ভাড়াটে পেয়াদার হাতের থাবায় এক মুহূর্তে আমাদের সকলের নাম হয় শ্যামলবরণ আর আমাদের বর্গক্ষেত্রগুলি গোনাগাঁথা হয়ে যায় এ রাতের কথায় দাগচিহ্নে হিসেব রক্ষিত হয় আমাদের নামের পাশে টিকমার্কে লিখে রাখা হয় সালতামামি ও ক’ বলে ক’ উইকেট এহেন দুর্বোধ্য সব ডাটা।

আর নেপথ্যে পোস্টার পড়ে এই মর্মে যে সব কিছুই হে কমরেড বিপ্লবের স্বার্থে।

পেম ও পোতিগ্গা

March 15th, 2008

পেম ও পোতিগ্গা
[2007]

এখানে খুলির সামনে সকলেই কৃষ্ণাঙ্গ প্রেতাত্মার গান শোনে ও বড় হয়। তাদের কেল্‌টি চামচাদরে স্টিকার লাগে ঝিকিমিকি আর কেন্নোবাতাসে আমাদের রোঁয়া ওড়ে ফুর-ফু-র ফুর-ফু-র, যেন ফুলকো বিকেলের কোনো শহরে বা দেয়ালে লেগে থাকে আমাদের বালছাল, পেম ও পোতিগ্গার মুহূর্তে করা আমাদের দু’একটি নৃশংস পোস্টারের স্কেচ ও তাদের বারবেলার গ্রাফাইট।

ফলতঃ এ কেলে কেলে পেম-পোতিগ্গার হাবলা নাদানিতে মলমের বেওসা জমে খুব আর টিভিতেও বিজ্ঞাপন সিনেমাতে ও কাগজেও দ্যাখা যায় পেম ঝরছে চাদ্দিকে, পোতিগ্গায় ভরে যাচ্ছে আমাদের কালোকুষ্টি ইতিহাসের পাতা।

কয়েকটি ছোটো গল্পের একটি ছোটো সংকলন

March 15th, 2008

কয়েকটি ছোটো গল্পের একটি ছোটো সংকলন

একটি ছোটো গল্প ও তার পাঠসহায়িকা
[2007-8]

ছোটো বাজারের মাঝেই লেডিস বিউটি পার্লার। রোগা মেয়েটির হাতে কাজ থাকে কম। তাই সে নিজেই নিজের চুলচূড়ায় মাথা বেঁধে ফ্যালে রোজ সকালেই। আর আয়নার লেপ্টে থাকে তার লাল জামার দাগ।

————
12/1/2007 তারিখ সকাল 11টা 38 মিনিটে জেবতিক আরিফ তাঁর পাঠসহায়িকায় বলেন:

আলোচ্য গল্পটি ছোটো হলেও অত্যন্ত জটিল একটি গল্প। এখানে লেখক ব্যাপক সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। প্রথম শব্দ ‘ছোট বাজার’ পড়ার সাথে সাথেই আমরা বুঝতে পারি কোথাও না কোথাও একটি বড়ো বাজারও আছে। এইযে, বড়ো বাজারের কারনে, উল্লিখিত বাজারটির ‘ছোট বাজার বলে পরিচিত হয়ে ওঠা, প্রকৃতপক্ষে বাজারে বাজারে শ্রেনী বৈষম্য এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতির অসারতা প্রমানে লেখকের একটি স্বার্থক চেষ্টা।

আপাততঃ গল্পের প্রথম শব্দবন্ধটি নিয়ে আলোচনা হলো। এভাবে প্রতিদিন একটি করে শব্দের ওপর আলোচনা হবে। যারা এটিকে ছোট গল্প হিসেবে বেশী ছোট ভাবছেন, তাদের তখন মনে হবে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান একটি ছোটগল্প পড়ছেন। সুতরাং হতাশ হইয়েন না।


সান্ট্রোবালা - আলটোবালির গল্প
[2007]

একটা গল্প লেখার কথা ভাবি - সান্ট্রোবালা আর আলটোবালির গল্প। সান্ট্রোবালা খুব ঝিংকু, আলটোবালির চামকা গতর। সান্ট্রোবালা রোজ সকালে লেজলোপাটের পেন্টু পরে, আলটোবালির ছাপুর ভাঁজে কলমগোঁজা। সান্ট্রোবালার দুধপরিজে কফির ছানা, আলটোবালির রসের ভাঁড়ে কমলানেবু। রোজ দুজনায় রোদ বিছানায় সকাল কাজে কাল্‌টি মারে আর সান্ট্রোবালার নেংটি ওড়ে ব্যালকনির দড়িতে; আলটোবালির চুলের নুটি হাওয়ায় চড়ে হাওয়া হয়ে যায় নিচতলার উঠানে। মাঝে মাঝে দিল মে টিং টিং ঘন্টি দিলে এফেম বাজে। তখন সান্ট্রোবালা আলটোবালি লিফ্‌টলতিকায় দেওয়ালমুখে কনুই মারে আর বেসমেন্টে ধাক্কা খেলে কায়দা করে আগুপিছু হয়। চিৎচাতালে খুট খুট ক’রে আগে যায় আলটোবালির জুতি আর পেছু পেছু খট্‌ খট্‌ সান্ট্রোবালার জুতো।

তারপর, দুজনে দু’দিকে চলে যায়। সান্ট্রোবালা তার সান্ট্রোতে আর আলটোবালি, আলটোতে। তাদের কনুইগুলি আবার লাইন মারে সেই সন্ধ্যে হলে, তবে।


সাদা মার্বেল কালো পরী
[2007]

গেরামের ঠিক মদ্যিখানে মস্ত দিঘি। জল টলটল বৈকেলে সেকেনে রাজ্যির মদ্দা মাগী, দিঘির পাড়ে উবু হ’য়ে, জলে ন্যাজ ডুবিয়ে বস’ থাকে। রাঙাপিসোও সেকেনে রোজ নেশার মতো। মাজেসাজে আবার ন্যাজের ডগায় কোঁচানো উড়নি; রিবন দিয়ে ন্যাজে ফুল বেঁধে রাঙাপিসিও সেদিন সঙ্গে সঙ্গে যায়। যেতে যেতে ব’লে, আ মোলো যা, বুড়োর ঢং দ্যাকো! বলি ন্যাজে সদ্দি হ’বে যে!

গেরামের ঠিক মদ্যিখেনে মস্ত একটা দিঘি আর সে দিঘির পাড়ে বৈকেলবেলায় ন্যাজ ডুবিয়ে ব’স থাকাটাও এখেনে অনেকদিনের রেয়াজ।


পেমপত্ত
[2007]

পিংকিরানির বয়স ষোলো আর পিংকুবাবুর সতেরো। ফলতঃ পিংকিরানির গোলাপী ফিতেফ্রকে পিংকুবাবুর কেস বেশ খারাপ হয়ে যায় রোজ সন্ধ্যেবেলার টিউশানি হাওয়ায়। পাতলা গলিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিংকুবাবুর হাঁটু খুলে গেলেও ডিউটিতে কামাই থাকে না আর ফিলোজফিফেরৎ এসব দেখে পিংকিরানির ঢিবিতে ঢিবঢিব হয় খুব।

এমনই চলতে থাকে রোজ রোজ, কিন্তু বেস্পতিবার মাস্টামশায়ের বউয়ের লক্ষীপাঁচালি আর ইন্ডিয়ার ম্যাচ একইদিনে পরার ফলে, পিংকুবাবুর অংক ক্লাস ছুটি হয় তাড়াতাড়ি আর গলির মুখে নালার পাশে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘন্টাখানেক এক্সট্রা। তার উপর যাওয়ার পথে কোচিং-এর ফালতু পার্টি হালকা হ্যাঁটা দিয়ে যায় - ‘দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়েচিস তো পিংকু? দেওয়াল ধরে দাঁড়া! দেওয়াল ধরে দাঁড়া!’ ফলতঃ সেদিন পিংকিরানি ফিলোজফি শেষ করে বেরোতেই পিংকুবাবু দড়াম্‌ করে সামনে দাঁড়ায় ও আচমকা একটি চোতা ধরায় তার হাতে। আর সেই চোতা-ধরা হাত ধরেই ধরা গলায় বলে ‘আমার পেমপত্ত! তোমাকে! ইয়ে পিংকি, আমি না .. আমি না .. আল্লা ভিউ পিংকি!’ নিশ্চিন্ত পারাবতযূথমধ্যে এবিধ হুলোবেড়ালের আকস্মিকতায় মেয়েরা চিলুবিলু করে ওঠে। পিংকিরানিও স্বভাববোধে। উত্তেজনা বা খুশিতেও সম্ভবতঃ। কলোনীর ধোঁয়াজড়ানো ছ্যাবলা অন্ধকারে আর কিছুই দেখা যায় না। ফলে গলতা থেকে হুড়মুড়িয়ে বেরোনোর সময় মেয়েরা যে হালকা হল্লা তোলে, তাতে স্যামলদা স্যান্ডোম্যানের বিবেক জেগে উঠলেও সে এসকল হাঁড়ির খবর কিছুই জানতে পারে না।

গলির ভেতর তখন হাবা গণেশের মতো দাঁড়িয়ে থাকে পিংকুবাবু। দেওয়াল ধরে বা না ধরে। পানসে বাতাসে পৎ পৎ উড়তে থাকে পিংকিরানির ফেলে যাওয়া পিংক ওড়না। আর পিংকুবাবুর পেমপত্ত। তার পিংক ফ্লুরোসেন্ট।

খুন শব্দে শব্দের খুন

March 1st, 2008

খুন শব্দে শব্দের খুন
[2007]

এক সহৃদয় মানুষের কাছ থেকে শব্দ খুন করার কায়দা শিখে নিতেই - আর্তনাদ শুরু হয়; কী-বোর্ডে ও সেই হেতু স্ক্রীনেও। বোঝা যায় অলরেডী আতাক্যালানে দুটো-চারটে শব্দরা খুন হচ্ছে এ’পাতা ও’পাতায় আর বাওয়ালবিধির ব্যাকরণ বইয়ে বানানবিধির বাওয়ালী হ’লে, শব্দের ন্যাড়া লাশে ভেসে যাচ্ছে ভাষা ও নোটবই, তার ক্যাবলা আকাশ। ফলে, অনেকেই খুন চাইছে খুন শব্দে শব্দের খুন, খুনী বোতামের মতো, খট খট খট খট - শব্দের ব্যাকস্পেসে খুনী শব্দের খুন করছে বেছে বেছে।

সে শব্দে আসলে শব্দের খুন। সে শব্দ আসলে শব্দ খুনের শব্দ।


এই লেখাটি স্বাধীন নয় ও অনেকটাই পূর্ব প্রসঙ্গের উপর নির্ভরশীল, যে প্রসঙ্গ আবার এ প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। লেখাটি কোনো এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা, যেখানে ভুল বানানের শব্দগুলিকে খুন করে, তাদের জায়গায় ঠিক বানানের শব্দগুলিকে আনার কথা বলা হয়েছিলো। চরিত্র নয়, লেখাটির গঠনটি ভালো লেগে গেছিলো বলে এটি জমা পড়লো এই লেখালিখির খাতায়

তাৎক্ষণিক তাৎপর্যমন্ডিত ও পূর্বানুসঙ্গনির্ভর এই লেখাটি আদিতে লেখা হয়, সামহোয়্যারইনব্লগে ‘একটি বাংলা ব্লগকথায়’ , 2007 সালের 8ই মে তারিখে। দুই চারিটি কাব্যময় মন্তব্যের সহিত আদি লেখাটি পড়ার জন্য ক্লিক করা যেতে পারে এখানে

কলকাতা বইমেলা

February 11th, 2008

খবর পেয়েছিলুম বইমেলা শুরু হবে উনতিরিশে জানুয়ারী আর সেই আশায় নাচতে নাচতে কলকাতা হাজির হলুম তিরিশ তারিখ। আর পৌঁছে শুনলুম, কলকাতা বইমেলা নামক গাজরটি, প্রথমে চন্দ্রমুখী আলু থেকে পরে ক্রমে আঁটিসার বিলিতি আমড়া ও হাইব্রীড চালকুমড়ো হয়ে, এবারে একটি কানা রাঙামূলোয় পরিণত হতে চলেছে। ফি বছর মেলা শেষে মাছভাজার খোসা, ব’য়ের উড়ুনি আর এঁটো খড়বিচালি কুড়ুতে কুড়ুতে জলপাই কাকুদের মেলা গোঁসা হলো। তাই তেনারা হুড়কো দিতে উটে পড়ে লাগলেন। ফাঁক বুঝে, গিলুবাবু নিলুবাবু এন্তার পোতিবাদ বিলুলেন। ধেড়ে প্রকাশকরা কেউ মুখ বাঁকালেন, কেউ পোঁদ। ছোটো প্রকাশকরা নিজেদের পেট চাপড়ে কপাল ফাটিয়ে ফেললেন প্রেস আর কাগজোলার বাকীতে। গুদোমে ও গোয়ালে বই আর নাদা জমে পাহাড় হলো। নেপোবাবু দই খাবেন বলে দুটো প্লেট আর একটা এক্সট্রা চামচ দিতে বললেন।

আমোদগেঁড়ে জনতা বেকুব বনে বসে রইলো সার্কাসের মাঠে।

হাতের লেখা

January 28th, 2008

ডাকে কিছু কবিতা এলো। ফুলস্কেপ কাগজে লেখা হাত ও কলম। ঘোরানো ঘরোয়া শব্দের মাথাগুলি গোল হয়ে উঠে বা কখনো নেমে, পরষ্পরের কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে, যেন ভাঁজ করা পাতার এলোপাথারি মাঠজুড়ে সাঁওতালি নাচ জমেছে খুব চাঁদের আলোয়। মাঝে মাঝে কিছু দর্শনার্থী, ট্যুরিস্ট লালে লেখা হেড লাইন, দিকনির্দেশ, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

এসব দৃশ্য দেখে ছোটোবেলার সেই হাতের লেখার কথা মনে হয় যে রোজ বিকেলে গল্প করতে আসতো সান্টুদের বাড়িতে আর সন্ধে হলে রুলটানা খাতার বারান্দায় বসে ঢুলে ঢুলে নামতা পড়তো চাপাসুরে। ছোটোবেলার ঠিক পরের বেলায়, যেদিন ‘স’ ‘জ’ ও ‘ম’ লেখার কায়দা বদল হয়, সেদিন এই ছোটোবেলার হাতের লেখা খুব দুঃখ পায় ও সারারাত অঙ্কখাতার পেছনের রাফ করার পাতায় বসে বসে মিহিসুরে কাঁদে। পরদিন সকাল থেকে তাকে আর দেখা যায় নি, শুধু একবার ছাড়া। তখন মেজোবেলার হাতের লেখার রমরমা। তার ঠাট কায়দায় ছোটোবেলার হাতের লেখার কথা মিলিয়ে যায় অচিরেই।

এর অনেকদিন পরে, যখন বড়বেলার হাতের লেখাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানিয়ে হাতের লেখার বাড়িতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন, ইনফ্যাক্ট তখনি শুধু একবার, ছোটোবেলা, মেজোবেলা ও বড়বেলার তিন হাতের লেখাকে পরষ্পরের গলা জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখা যায়। সেই শেষ। তারপরে তাদের কাউকে আর দেখা যায় নি।

আজ ডাকে আসা কবিতা দেখে তিনজন হাতের লেখার কথাই মনে পড়ে বার বার।

কৌরব 23

January 4th, 2008

Kaurab Online: Cover of Bengali Literture

কৌরব অনলাইনের 23তম সংখ্যা প্রকাশিত হলো। প্রতিটি সংখ্যাতেই যেমত সযত্ন সাহিত্যযাপনের ছাপ দেখে আজকের এই টান ভালোবাসা, 23-ও তার ব্যতিক্রম নয়। কৌরব অনলাইন 23-এ যা শুরুতেই মনোযোগ টানে, তা এক দল নতুন কবির নতুন কবিতা ও নতুন গদ্য। আর জন অ্যাশবেরীর কবিতা নিয়ে আর্যনীলের ধারাবাহিক লেখার দ্বিতীয় পর্ব

অ্যালবার্ট অশোকের রং ও আবছা আদলের নির্ণিমেষ চোখ মেলে থাকা প্রচ্ছদ (ছবি: উপরে) থেকে শুরু হয় এক পাঠনির্মাণ যা ক্রমপ্রত্যাশী যখন নতুন কবিতার পাতায় আঙুল। অতনু সিংহের কবিতায় ভাব ও সচেতনতার অবচেতন ছড়াছড়ি ও তা প্রতীকমুখিনতায় প্রায়শঃ ভারাক্রান্তও। বক্তব্যপ্রধান ও স্লোগানধর্মী এইধরণের লেখাতে আমাদের দেওয়ালগুলি অচিরে ভরে উঠবে, এই-ই কেবল আমাদের আশা। লুবনা চর্যার “বাই প্রোডাক্ট” সিরিজ পরিশ্রমের আভাস দেয়, ভালো লাগে সেগুলির ফর্মনিবিষ্টতা। হিন্দোল ভট্টাচার্যের ছোটো লেখাদুটি, দুটি সাদা রুমালের বিষণ্ণতা; শোকসভায় নীরবতাপালনের মাঝে অস্ফূটে ডুকরে ওঠা কিশোরীর চাপা কান্নার মৃদু শব্দ। আর সুবীর বোসের হারিয়ে যাওয়া হাওয়াই চটিতে, নরম তুলিতে, হেসে ওঠা পেনসিলে মাঝে মাঝে লেগে থাকে তার ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমা। তবে বেনামী চিঠি বেশ মৃদু ও সাবধানী ঠেকে। সাইফুল্লা মাহমুদ দুলালের লেখায় বরং অনেক নিজস্বতা ও নতুন উচ্চারণ, নতুন শব্দবোধের আভাষ। বিষয়কে এত কাছ থেকে দেখা, একপ্রকার বিভ্রমের হেতু হয়। ঘোষণায় তখন চোখে পড়ে মোমালো শব্দের ঋণ। প্রদীপ চক্রবর্তীকে নবীন বলা যায় না তার নতুনত্ব ও ভাষাগঠনের মুন্সীয়ানায়। নতুন নতুন শব্দ ও তাদের নতুন নতুন সম্পর্কের টানাপোড়েনকে প্রদীপ তার ছোটো ছোটো বাক্যবন্ধে ধরে রাখেন সুন্দর। রঙ্গীত মিত্রের কবিতার থেকে তার পরিচিতিটি চিত্তাকর্ষক ঠেকে ও পরিচিতিপাঠশেষে কবিতাটি পড়লে সত্যই মনোগ্রাহী একটি ছবি দেখা যেতে থাকে। শৈবাল সরকারের প্রথম কবিতাটি পাঠককে (পড়ুন আমাকে) টেনে নিয়ে যায় তাঁর দ্বিতীয় কবিতাটিতে, যা পুনরায় পাঠককে (আবার পড়ুন আমাকে) টানে তাঁর তৃতীয় কবিতায় ও তৃতীয় থেকে পঞ্চম, সপ্তম ও দশম কবিতায়, যা কৌরব 23-এ থাকে না বলে পাঠক (এবারে পড়ুন আমি) অল্প দুঃখিত হই। অরিন্দম রায়ের সবেধন নীলমনি কবিতাটি মন দিয়েও পড়েও বেশ আবছা ঠেকে ও মনে “একটি কবিতা পড়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক না” গোছের একপ্রকার ডিপ্লোম্যাটিক ভাব দেখা দেয়।

নূতন বাঙ্গালা অভিধান - শিল্পি

January 1st, 2008

শিল্পি: বিণ. [’ঐ’ মাল; ‘ঐ’ লোক] বানানভেদ ও অর্থভেদে ‘শিল্পী’; চতুর ও শঠ ব্যক্তি, যে ব্যক্তি শঠতায় ও চাতুর্যে শিল্পীর ন্যায় নিপুণ।

ব্যাখ্যা:
কলকাতার উত্তর শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় ‘শিল্পি’ (’শিল্পী’-র বানানভেদ) শব্দের এক অভিনব ব্যবহার দেখা যায়। এতদঞ্চলে, কোনো ব্যক্তিকে যদি ‘শিল্পি লোক’ বা ‘শিল্পি মাল’ বলে অভিহিত করা হয়, তাহলে কখনোই উক্ত ব্যক্তির কলাপটুত্বের কথা বলা হয় না, বরং তার শঠতা ও চাতুর্যের প্রতি অঙ্গুলিনির্দেশ করা হয়।

উদাহরণ:
1. “তোমাকে বিশ্বাস করা যাবে না, গুরু! তুমি বহুত শিল্পি মাল আছো!”
2. “আমাদের মধ্যে গেঁড়ে ছিলো সবথেকে শিল্পি ছেলে! সবার আগে কায়দা করে কেটে গেছিলো!”

বইপাড়ার গান

December 12th, 2007

বইপাড়ার গান »

বইপাড়া ডট কম এবার বের করলো বইপাড়ার গান, যা বইপাড়ার শীর্ষসঙ্গীত হিসেবে এ মরসুমে মার-কাটারি হিট যাবে বলে নিন্দুকেরা উচ্চাশা পোষণ করছে। গানটি লিখেছেন, সুর দিয়েছেন, গেয়েছেন, বাজিয়েছেন এবং শুনেছেন - অনুপম রায়।

অনুপম বাঙালী ও কবি। তাই অনুপমের বাংলা লেখালিখি পড়া যেতে পারে এইখানে »
aroyfloyd.blogspot.com

বইপাড়ার গান এমপি3 হিসেবে সংগ্রহ করা যেতে পারে এইখানে »

বুনো মরিচের জঙ্গল ও একটি প্রচ্ছদকাহিনী

October 7th, 2007

Digital Art by Samit Roy

“…তোমাকে দেখাতে পারতুম বুনো মরিচের জঙ্গলে ঠ্যাঙ্গাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে…” - কমল চক্রবর্তী

বাবু কমল চক্রবর্তীকে দেখতুম দূর থেকে কখনো খুব কাছে আড়চোখে, কৌরব স্টলের বইমেলায়। সাহস ছিলো না, তাই আলাপও। আমাদের তখন হাতেখড়ি হয়ে গেছে পেন জুড়ে নেমে আসছে কিশোর বিদ্যুতের রেখার মতো নরম গোঁফের রোম। আর রোয়াবে পিঠের কাঁটা খাড়া। আমরা তখন লিখতে শিখছি ও কথা বলতেও। আমাদের কলমের শব জমছে দিগন্ত জুড়ে ধু ধু পুড়ে যাচ্ছে তখন আমাদের না-লেখা পান্ডুলিপি, খাতা।

তারপর, অনেক শেখা, অনেক ঋণ। আর, তারও অনেক পরে, আমাকে গদ্য লেখার সাহস ও শিক্ষা যোগান তিনিই। তবে, সেকথা তিনি জানতেন না।

কমল চক্রবর্তীর লেখা নিয়ে আমার প্রথম সচেতন নির্মাণ উপরের ছবিটি। নেহাতই সরলীকৃত চিত্রণ, আক্ষরিকও। বুনো মরিচের ঘন সবুজ লতার জঙ্গল প্রথম দেখি কুর্গে এবং তা মনে থেকে যায়। তাই, বুনো মরিচের সবুজ পাতায় ঘুমন্ত ঠ্যাঙাড়ের মুখ চিনতে আমার অসুবিধা হয় নি। আর্যনীল ভালোবেসে ছবিটি দিয়ে কৌরব অনলাইন 14-র প্রচ্ছদ সাজায়, 2005-এ।

ছবিটি আঁকা হয়ে গেলেও লাইনটি থাকে। কয়েকমাস বাদে ছবিটি দেখতে দেখতে সহসা ছবিটিকে বদলানোর তাগিদ অনুভব করি ও তৈরী হয় নীচের ছবিটি।

Digital Art by Samit Roy

এই অব্দি আঁকা হলে বুঝতে পারি, ছবিটির সঙ্গে সুক্ষ্মভাবে জড়িয়ে আছে একটি লেখা, যেটি তখনো আঁকা হয় নাই, লেখাও। ফলতঃ সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক কর্তব্য পালনহেতু আমি বেশ তর তর করে লেখাটি লিখে ফেলে বেশ তর্‌ হয়ে যাই। লেখাটি নিম্নরূপ:

প্রচ্ছদকাহিনী
[2006]

“তোমাকে দেখাতে পারতুম বুনো মরিচের জঙ্গলে ঠ্যাঙ্গাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে”
[প্রিয় কমল চক্রবর্তীকে, যিনি আমাকে বাংলা গদ্য লিখতে শিখিয়েছিলেন]

তোমাকে দেখাতে পারতুম:

তোমাকে দেখাতে পারতুম বললেই তোমাকে দেখাতে ইচ্ছে হয় খুব এই শহরসীমানার আকাশরেখায় ইঁট ইঁট বালি কাঠ পাথর পাথর আর চুনকাম চাতাল - এ সমস্ত জুড়ে কী চমৎকার বুনো মরিচের লতা ক্রমে বেয়ে উঠছে ঘন সবুজ ছায়া অ্যাপ্ড়ন ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়ছে ঠ্যাঙাড়ে রোদএর মতো আমাদের বাংলা মানেবই, ডিক্‌শনারী, ক্লাসটেস্ট, পরীক্ষার সুতোবাঁধা খাতা আর লাল কালি ডট পেন। আমাদের বোল ফুটছে মোম মোলায়েম গোলমরিচের ঝোপে দেখো শানিয়ে উঠছে আমাদের কাস্তেকাহিনীর গঠনরীতি আর তার হাতলবিহীন আলগা কারুকাজ। এইসব, এ সবই তোমাকে দেখাতে ইচ্ছে করে আজ ঝোপলতার ভারী পাতায় কেমন গড়িয়ে গাঢ় হচ্ছো তুমি মাদাম সবুজ আর গোকুলে বেড়ে উঠছে আমাদের লিখনভঙ্গির হাহাকার, ঘুমখুনিয়া মরিচলতায় আঁকা আমাদের এইসব এলোমেলো প্রচ্ছদগাথা; ছবি।

বুনো মরিচের জঙ্গলে:

বুনো মরিচের জঙ্গলে তোমার কথা ভাবতেই জীপচিৎকারের আলো ছিটকে পিচরাস্তার চেরা সিঁথি আর ঝুঁকে থাকা অরণ্যকেশে ফুটে ওঠে ঠ্যাঙাড়ের ঘুমন্ত চোখে এক অনর্গল পেন্সিলকাহিনী ও তার বাঁধানো মলাটে ঘেরা রুলটানা হোমটাস্ক; কাহাদের নামলেখা খাতা। এ বনবীথি মাঝে সন্ধ্যা নামিলে দুরূহ মরিচলতায় দেখো মৃদু আলোড়নে কেঁপে ওঠে আমাদের শ্বাসবৃন্তে ঝুলে থাকা বানানবিধির ছাপানো পোস্টার আর ব্ল্যাকবোর্ড জুড়ে আঁকা চকখড়ি, শেষ পিরিয়ডে নেওয়া যত ব্যাকরণ ক্লাস। এবারে তবে তুমি এ ঘুমপাতার মরিচ আঁধারে দস্যুর চেনামুখ দেখো কেমন দাগিয়ে দেওয়া প্রশ্নপত্রে খুব গাঢ় ও সবুজে ঝিম জমেছে এইসব বর্গীর বুলবুলি গান। তবে কি, আজ এ মরিচবনে এই-ই হবে আমাদের ঘুনু-ঘুনু খেলা?

ঠ্যাঙাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে:

ঠ্যাঙাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে জেনে এখন দেখো এ মরিচজঙ্গলে শান দেওয়া হয় পুস্তকবারান্দায় চাপা রাখা আমাদিগের অষ্টমশ্রেণীর দেওয়ালপত্রিকা ও তাহার শেষনাহওয়া গল্পগুলির তক্তাপোষা ব্লেডবিদ্রোহগাথা। বুনোমরিচের ঘুমজঙ্গলে এখন আমাদের শিবিরকথনের ক্লাস শুরু হয় ফার্স্ট পিরিয়ডেই বি.সি.বি.-র রোলকল হয় পেজেন প্লিজ আর লাস্ট বেঞ্চের পুরনো হাতলে দএখো বানানবর্ণনায় কম্পাস লেখা হয় খুলে রাখা সাদামোজা টিফিনবাক্সের শান্ত পাঁউরুটিদের কথা। তোমাকে দেখতে পারার প্রসঙ্গে আজ আমাদের রোজটিপিনের আলুমরিচে ঘুমিয়ে পড়ে ঠ্যাঙ্গাড়ের জঙ্গলবই আর তার আঁকাবাঁকা ফটোবিকেলের গলার বোতামআঁটা বেমওকা নীলডাউনের প্রথা। তোমার এ মরিচবনে আজ ঠ্যাঙাড়ের ঘুম দেখে খুব হ্য় খুনফাবড়ায় টিউশানি টেবিলগুলির জনিসোকো মিস্‌ করা রচনাবইয়ের সাথে ব্রাউন মলাটে ঘেরা খাতা। তবে কি ক্লাসবৃ্ত্তের বানারেখায় আজি পুরাইলো ঘুমঠ্যাঙাড়িয়া ভেউবৃ্ত্তিরো পালা!

Unable to see Bengali text? Read this text as a GIF »

লেখাটির প্রথম কিছু অংশের ইংরিজিফরাসী ভাবানুবাদ করেন, রুফ্‌লাকেত দোরে মহাশয়।

পুনর্নির্মাণ

October 1st, 2007

DIgital art on reconstruction by Samit Roy

আমার মনে হয়, শিল্পবস্তুর নির্মাণ অর্থে পুনর্নির্মাণ হয় উপভোক্তার চেতনায়, উপভোক্তারই সচেতন বা অচেতন প্রায়াসে। শিল্পবস্তুর মালিকানার দাবীতে শিল্পীর থেকে উপভোক্তা এগিয়ে থাকেন। শিল্পী একটি প্রক্রিয়ার শুরু করেন মাত্র আর সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণতা পায় উপভোক্তাগণের চেতনপ্রবাহের আবেশপ্রাপ্তিতে।

আমি যখন, ‘মোনালিসা’ দেখি, তখন আমি ভিঞ্চিসায়েবের হাতের কাজ যতটা না দেখি, তার থেকে বেশী দেখি - এই বাঁধানো রংমাখানো কাপড়ের টুকরোটিকে ঘিরে পাঁচশো বছর ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপীয় শিল্পবোধের বিকাশ; দেখি শিল্পভোক্তাদের চোখ ও চেতনা জুড়ে সুদীর্ঘ সময় ধরে ‘মোনালিসা’ নামক এক সৌন্দর্যপ্রতিমার গড়ে ওঠার কাহিনীকলাপ; দেখি সৌন্দর্য মানে পেলব ত্বকের উজ্জ্বল গম; দেখি শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে দীর্ঘ জনশ্রেণী ধৈর্য ধরে রূপসী রমনীর ব্রীড়া বলতে চিনে নিচ্ছে দেওয়ালে আঁটা এক টুকরো সোনালী ফ্রেম। আর দেখি, কিভাবে হাজার হাজার মোনালিসা উড়ে যাচ্ছে অটোরিকশার ব্যাকসীটে, পুরুষ সেলুনের দেওয়ালে আঁটা ভারী স্তনে, জালি পোস্টারে, বসে আঁকো বালিকার প্রবল পেনসিলে। দেখি পুনর্নির্মাণ

বইপাড়ার ব্লগপাড়া

September 30th, 2007

boipara.blogspot.com  - A Bangla Blog Aimed to Archive Bengali Literature

বইপাড়া ডট কম (Boipara.com - Online Archive of Bangla Literature) এবার চালু করলো বইপাড়ার ব্লগপাড়া। ইন্টারনেটে বাংলা সমান্তরাল সাহিত্য ও অপ্রাতিস্ঠানিক সাহিত্য পত্রিকাগুলির বৈদ্যুতিন সংরক্ষণের যে নিরলস চেষ্টা বইপাড়া ডট কম চালিয়ে যাচ্ছে, ব্লগপাড়া সেই প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আরও একটি নতুন মাধ্যম।

বইপাড়ার ব্লগপাড়া পাওয়া যাবে নীচের ঠিকানায়:

http://boipara.blogspot.com

বইপাড়ার ব্লগপাড়ায় এযাবৎ প্রাকশিত লেখাগুলির মধ্যে কিছু বাছাই:

ফালগুনি রায়ের কবিতা »
অমিয়ভুষণ মজুমদারের ছোটো গল্প »
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আত্মজীবনি (অসমাপ্ত) »
হিরণ মিত্র: লেখায় ও আঁকায় »

লেখালিখির খসড়া

September 29th, 2007

লেখালিখির খসড়া
[2007]

1.
মায়ের জন্মদিন মনে নেই। বাবার জন্মদিনও। একটু ভাবতে, বাবার মৃত্যুদিনও মনে নেই, শুধু এইটুকু মনে পড়ে। তবে মনে পড়ে, নিজের জন্মদিন মনে আছে। নেতাজীরও।

2.
একবার ভালোপাহাড় গেসলাম। সেখানে রাত্রে খুব জোসনা পরেছিলো। আর মহুয়া। আর হিম। বাগানে একটি রূপসী লেবুগাছ ছিলো যে সত্যিই একটি লেবুগাছ ছিলো। আমি ঠা ঠা চাঁদের নিচে দাঁড়িয়ে তার পাতায় পাতায় তিনটে-পাঁচটা চুমু খেয়েছিলাম। সব গাছেদের সামনেই। খুব সুখ হয়েছিলো। আমার তখনকার স্ত্রী ও প্রেমিকা সেসময় ঘুমুচ্ছিলো। ঘরে। তারা মানুষ ছিলো।

দুঃখজনক লেখাগুলি

September 27th, 2007

দুঃখজনক লেখাগুলি
[2007]

1: মার্চ 2007

হৃদ মাঝারে রাখবো ছেড়ে দেবো না ক্ষ্যাপা গান গায় ও ভুল শোনে ক্ষ্যাপা গান গায় ছেড়ে দিলে সোনার গৌর আর পাবো না আর তাই ক্ষ্যাপা গান গায় না না ছেড়ে দেবো না আমার হৃদয়ে রাখবো ছেড়ে দেবো না আসলে কোনো কিছু হৃদয়ে রাখা যায় না কারণ কতিপয় সুনির্বাচিত মাংসপেশী ব্যতীত হৃদয় বলিতে কিছু নাই ও এবম্বিধ যাবতীয় মশকরা শুধু ক্ষ্যাপাদিগের মধ্যে দেখা যায়। ফলে, সোনা বা গৌর হৃদয়ে থাকে না শুধু থাকার ভান হলে বোঝা যায় দূরে কোথাও আসর বসেছে রাতভর গান হচ্ছে সুফিয়ানা কালামে ভরে যাচ্ছে কারো কারো মগজের লাল ম্যাগাজিনগুলি।

2: মার্চ 2007

আমাদের হুলাহুপ, কথাবার্তা নদীতে যে ষাঁড় ঢোকে চিনেমাটির বাসন সামলে সেও চুপ, নতশিং, শুধু হুলাহুপ, কথাবার্তা নদীর বক্ষে ঢেউকুড়কুড় লোনা আঁশের আঁটি চেটে ফেলেছে ব’লে তার রং বদলায় সবুজ বা নীল কখনো সাদাও। অথচ হুলাহুপ, কথাবার্তা নদীতে সেদিন গঞ্জের ছেলে বুড়ো মাগী মদ্দা সকলেই স্নান করে ও আঁচায়, নিজের লিনেন কাচে মেঠো সাবানে, কেউ ভুলে কুলকুচি করে ফ্যালে। তাই আমাদের হুলাহুপ, কথাবার্তা নদীতে আজ যে নীল-সাদা ষাঁড় ঢোকে, চিনেমাটির বাসন সামলে সেও চুপ, নতশিং, শুধু অভ্যাসে জাবর কাটে ল্যাজে ও গোবরে। সে জাবরের ঘসঘসে শব্দ নদী ও হুলাহুপে ক্রমে কথাবার্তারূপে প্রতীয়মান হলে চীনেমাটিতে চিড় ধরে আর ও গ্রামে কাঁঠাল পাকলে তার গন্ধ নদী ও হুলাহুপ কথাবার্তা পেরিয়ে ছড়িয়ে যায় এ গ্রামে ও সে গ্রামে।

3: মার্চ 2007

সে এক ম্যাওপাখির কথা যার ডানায় ঘুড়ির সুতো লেগে যায় বলে অমন মিশমিশে কড়িটানা পেটকাটিটা ফেঁসে যায় সুতোও হারিয়ে যায় বেশ কিছু ভালো মাঞ্জা আর বাবুসোনার তাই বড় মনখারাপ হয় আর সে নায় না আর খায় না শুধু দাপটি করে উঠোনদুপুরে সেজগিনি্ন চুলের ঝুঁটি নেড়ে দিতে বাবুসোনার চিল চিৎকারে মটকা গরম হয় বড়বাবুর এমনিতেই পিত্তির ধাত তার উপর এই হারামীর বাচ্চা ভর দুপুরে মড়া কান্না জুড়লো কেনো বলতেই সেজ বাবু বলে উঠলো হারামী তোর বাপ যা শুনে উদুম বাওয়ালী লেগে গ্যালো আর হাতাহাতি আর লাঠালাঠি আর কাটাকাটি হতে হতে কোর্ট কাছারী পুলিশ আদালত কাজী পেয়াদা বাসনওলা তালমিছরী প্রস্তুতকারক বনেদী বেশ্যা আরামবাগের মুরগী সব ঝটপট ঝটপট ঝটপট করতে লাগলো আর সেই গোলমালে ম্যাওপাখির ডানা গলায় মাঞ্জাসুতোর ধার কেটে বসলে কেমন রক্ত বেরিয়ে লাল জমে কালচে হয়ে গ্যালো মাছিতে তা আর কেউ নজরই করলো না ।

4: এপ্রিল 2007

বাঁকানো হরফ ও চেনা কালিতে সাতসকালের রোদগুলি যখন জানলা গলে উড়ে আসে তোর হাতের লেখা হয়ে, তখন এ স্ক্রীনচেয়ারের বোতল-বালতি, এঘর-ওঘর জুড়ে বড় এলোমেলো হয় আর ছিটকিনির শব্দে ঘুম ভাঙলে তোর স্নানের দরজার কথা মনে হয় - সাদা ও বন্ধ ফলে ভাবলেশহীন।

5: এপ্রিল 2007

ঘরবাদলায় পেখম ঝলসে ওঠে। ল্যাজ ও নুটিতে বাঁধা হয় মন্ত্রশাস্ত্র, ধ্বনি। হুলুধ্বনি ও ভুরিভোজের আদলে গড়ে তোলা হয় লাইব্রেরী, শয়নকক্ষ ও গোটানো মাদুরের মতো টুকটাক কথাবার্তা; ছবি ও সই মেলানো লেবেল।

6: মে 2007

জোড়া বালিশ ও রক্তাক্ত চাদরের গল্পে আমাদের তাক্‌ লাগে, তুক্‌ হয়, বাণ মারামারি আর চালপড়া বাটিচালা চলে, শনিবারে ভর হয়। ভুডুর পুতুল থেকে উঠে বসে রণক্ষেত্র; পিতামহ শরশয্যায় এমত ক্যালেন্ডারের ছবিতে ভীষ্ম জল খান ও আমাদের দেওয়ালনির্বাচনের ইতিহাস লেখার বকলমে ভরে যায় বালবাগিচার খোশ গপ্‌সপ্‌।

আমাদের ছোটো ছোটো খাতায় তখন হাতের লেখার চাষ হয়; দেখে মনে হয় লগবুক রাখা হচ্ছে সেয়ানা শিবিরে।

7: মে 2007

আগের লেখার শনিবারের আগে ‘ফি’ শব্দটি বসানোর জন্য এ শনিবার লগিন বাগান ঘুমিয়ে পড়তেই ভূগোল খাতার পেছনের পাতায় শুরু হয় কাটাকুটি খেলার ভেজা ন্যাকড়াগুলির লাল রং আর বারিস হ’তে পারে বলে বিদায় নেবার কালে শেখসাহেবের খুদা হাফিজে বিন্দু বিন্দু কান্না দেখা দেয় সেই দুপুরবেলা থেকেই। অথচ ‘ফি’ শব্দটির মানে মনে আছে ছোটোবেলায় টিফিন বাক্স ছিলো, টিউশনি ও ডাক্তার; কোনোকালে ‘ফি’ মানে চোখে চুমু ছিলো। শনিবারও ফি ছিলো। তখন।

গুরু তোমায় … (সটীক সংস্করণ)

August 8th, 2007

ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি, প্রতি বছর, এই চোত-বোশেখ মাস এলে, দুনিয়ার লিটল ম্যাগাজিন, কালচার শপ ও আন্ডাবাচ্চাদের মধ্যে ভারি ঢলো-ঢলো ভাব হয়। আমি এদের কোনোটিই নই। তাই, বোশেখ মাসের পঁচিশ তারিখ কত্তাবাবুর আবির্ভাব হেতু আহ্লাদ করতে করতে নেজ নাড়ি নি কোনোদিনই। তবে বয়সকালে, খোঁপায় ফুলআঁটা তাঁতের শাড়ি দেখতে দু’একবার খোদ এলাকায় যে ভোরবেলায় ঢুঁ মারি নি, একথা হলপ ক’র বলতে পারবো না। কিন্তু সে আমলে, আমার থোবর থেকে হাওয়াই চটির সেপটিপিনে পজ্জন্ত এমন ছ্যাবলা ছ্যাঁচরামীর ছাপ লেগে থাকতো যে ফুলেল তাঁতের শাড়ী তো দুর অস্ত, এক পিস চৈত্র সেলের ছাপা শাড়ীও তখন আমার জোটে নি। কিছুটা সেই রাগেই, আর কিছুটা বিপ্লবের খাতিরে, আমি ক্লাস এইটের পরে আর কত্তাবাবার জন্মতিথি নিয়ে কোনো লেখালিখি বা কেত-কায়দা মারি নি। অবিশ্যি একবার একটা লেখায় বাঙালী বণিকের জাহাজ, পুরণো বাড়ি আর নমস্কার করার কথা ছিলো ব’লে, একটি পত্রিকা সেটিকে তাদের পঁচিশে বৈশাখ ইস্যুতে ছেপে দেয়। এ ঘটনায় আমার কোনো হাত ছিলো না। এর অনেক পরে, এই 2007 সালের পঁচিশে বৈশাখ দিবসে, তাঁতি সর্বপ্রথম ভেবে চিন্তে একটি এঁড়ে গোরু নিয়ে আসে। এঁড়ে গোরুটির হাতে হ্যান্ডহেল্ড, মুখে স্মাইলি ও তার চেহারাটি নিম্নরূপ:

গুরু, তোমায় ..

গুরু, তোমার জন্মদিনে পিঁক পিঁক এসেমেস পেলে মজা পাই আর পিন্ডদানের পাথরে বিষ্ঠার কারুকার্য দেখে মনে পড়ে আমাদের হাফপাত্‌লুন সকালগুলির মিহি ও অস্পষ্ট ধুয়ো ধরার কথা। মনে পড়ে গান ও গুঁতো গিলে খাওয়ার কোঁত্‌ কোঁত্‌ শব্দে সারা পাড়া কেমন মাথায় উঠতো রোজ ভোর ও বিকেলে। টুকে লেখা চিঠিও মনে পড়ে, মনে পড়ে কানহীন মানুষের ছবিতে ক্যামন ভরে যেত আমাদের দখিনো দুয়ার, জীবনো যৌবনো, ভরা বসন্তেরো কাল।*

ভালো থেকো গুরু, আলমারী ও ব’য়ের তাকে, দেয়ালে, আমাদের মাথার ভেতর।


*পরবর্তীকালে, “মনে পড়ে গান ও গুঁতো গিলে খাওয়ার কোঁত্‌ কোঁত্‌ শব্দে সারা পাড়া কেমন মাথায় উঠতো রোজ ভোর ও বিকেলে। টুকে লেখা চিঠিও মনে পড়ে, মনে পড়ে কানহীন মানুষের ছবিতে ক্যামন ভরে যেত আমাদের দখিনো দুয়ার, জীবনো যৌবনো, ভরা বসন্তেরো কাল।” - এই লাইনগুলি আমার ভারী প্রিয় হয়ে ওঠে।

জার্নাল 02

August 8th, 2007

বেশ কয়েকমাস লেখালিখির চৌহদ্দি থেকে বেপাত্তা। মনোযোগের অভাবের নামে দোষটা চাপিয়ে দিয়ে নিপাট দাঁত কেলাচ্ছি। জীবনের সঙ্গে তো ঝামেলা সেই হিন্দু হোস্টেল থেকে। জীবনের ভাগে তখন পাঁচ নং ওয়ার্ডের ক্যান্টিন আর আমি তখন অমিতাভর ভাগে, ঐ পাঁচ নম্বরেই। জীবনের এই পর্যায়েই জীবন প্রত্যক্ষ ভাবে আমার সামনে আসে এবং তার কালো তৈলাক্ত ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে 84 টা পান্তুয়ার দাম চায়। জীবন এর আগে, এবং এর পরেও, আমার কাছে এরূপ বেয়াক্কেলে আবদার খুব করেছে। ফলে, আমি হুঁ হুঁ তানানানা ইত্যাদি ক’রে যেতে থাকি। জীবন স্বাভাবিকভাবেই আমার উপর উদুম খেঁড়ে যায়। অথচ, এই আমি কী-বোর্ড ছুঁয়ে মা শেতলার কিরে কেটে বলতে পারি, জীবন বেটা ডাহা ঢপবাজ, 84 টা পান্তুয়া এক সঙ্গে শুধু আমি আমার জীবনে না, জীবনও তার গোটা জীবনে মনে হয় একসঙ্গে খেয়ে দেখে নি। জীবনের এই বেমালুম বেহায়াপনায় আমার হাড় জ্বলে গেলেও, পরে ‘ধূসর জীবনানন্দ’ পড়ে বুঝতে পারি, স্থান-কাল-পাত্রের ভেদ থাকলেও আসলে সকল জীবনের প্রকৃত স্বরূপই এইমত এক। অতএব জীবনের পান্তুয়ার হিসেব বুঝতে বুঝতে ঈষৎ ক্লান্ত হ’য়ে হেদিয়ে শেষ-মেষ আবার যখন কলম ঝাড়লুম, তখন দেখি কোথায় পান্তুয়া, বরং তেজারতির খাতায় খামোখা তেজপাতার আড়ৎ। এই বাজারে অনেক হেগে-পেদে যা-ও দু’একটি লেখা লিখলুম, তা-ও কেমন মিয়ানো মিয়াও মিয়াও শোনালো। লেখা বলতে ধকে কুলোলো না। বললাম, খসড়া। বাওয়ালীর নতুন ধুয়ো।

আসলে নিষ্পৃহতা এক প্রকার বিলাতি জামা, নীল বা চারকোল রঙের দেওয়ালে যা ঝোলানো থাকে। কোমরের কাছে লেগে থাকে লাল কাপড়ে মোড়া সাদা সুতোর একটি নাম। তাতেই সর্বস্ব বাঁধা থাকে।

নূতন বাঙ্গালা অভিধান - কেলো

July 7th, 2007

কেলো: 1. বি. অযাচিত ঝামেলা, ঝাম, বাওয়াল; ঘুষ লইতে গিয়া অথবা পল্লীস্থ বধূদিগের সহিত ফস্টি-নস্টি করিতে গিয়া ধরা পড়িলে যাহা হয়। 2. ক্রি. [ ~ ‘ঐ’ - হওয়া ] খামোখা ঝামেলা ও বাওয়াল শুরু হওয়া; ঝুলি থেকে বিড়াল বেড়িয়ে পরা। [ ~ ‘ঐ’ - করা ] বাকায়দা প্যাঁদানি খাওয়াইবার বা খাইবার উপক্রম করা; 67% অসাবধানতা 27% অকর্মন্যতা ও 6% নির্বুদ্ধিতার কারণে কোনো গোলমাল শুরু করা।